Breaking News

ঢাকা মহানগর আওয়ামীলীগের কমিটি থেকে বাদের তালিকা প্রধানমন্ত্রীর হাতে

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণের সম্মেলন আসন্ন। আর এ সম্মেলনে যে নতুন কমিটি আসছে, তাতে বাদ পড়তে যাচ্ছেন বর্তমান কমিটির প্রভাবশালী নেতাদের অনেকে। ক্যাসিনো কারবারিদের সঙ্গে সখ্য, টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রি, গুলিস্তানে মার্কেট দখল, ফুটপাতে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দলে কোন্দল সৃষ্টি ও প্রবীণ নেতাদের অবমূল্যায়নের অভিযোগে তারা রয়েছেন বাদ পড়াদের তালিকায়। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

শীর্ষ নেতারা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, এরই মধ্যে বিতর্কিতদের তালিকা প্রস্তুত করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের প্রবীণ নেতা ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সার্বিক সহযোগিতায় এ তালিকা তৈরি করেন তিনি। তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের আসন্ন সম্মেলনে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনার চিন্তা করছেন। এ রদবদল প্রধানমন্ত্রীর চলমান শুদ্ধি অভিযানের অংশ।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, কিছু কিছু জায়গায় অনুপ্রবেশ ঘটেছে। অনেকে আওয়ামী লীগের আদর্শ বিশ্বাস করে এসেছে। আবার অনেকে দলে ভিড়ে কোন্দল সৃষ্টি করেছে। আসন্ন সম্মেলনে অনুপ্রবেশকারী ও বিতর্কিতদের বের করে দেয়া হবে। দলের উচ্চপর্যায় থেকে নিুপর্যায় পর্যন্ত এ বিষয়ে মনিটরিং করা হচ্ছে।

ফারুক খান আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনে অন্তত ৫ বছর কাজ করেছেন- এমন কর্মীই এবার কমিটিতে স্থান পাবেন। অন্য দলের কেউ আওয়ামী লীগে যোগ দিতে চাইলে জনপ্রিয়তা দেখে এসব নেতাকে সদস্য করা যেতে পারে, কিন্তু পদ দেয়ার প্রশ্নই আসে না।

অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কঠোর হুশিয়ারি রয়েছে। তা সত্ত্বেও ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের বর্তমান কমিটি ঠাসা অনুপ্রবেশকারীতে। বিএনপি, গণফোরামসহ বিভিন্ন দল থেকে তারা যোগ দেন আওয়ামী লীগে। সূত্র বলছে, এদের বড় অংশই আসন্ন সম্মেলনে বাদ পড়াদের তালিকায় রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীমের মালিবাগের গণপূর্তের ভবন নির্মাণকাজ থেকে বড় অঙ্কের চাঁদা নেন গোলাম আশরাফ তালুকদার। ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি থাকাকালে নিয়োগ-বাণিজ্য ও কলেজের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। জনশ্রুতি রয়েছে, এ কারণেই তাকে তখন সভাপতি পদ হারাতে হয়।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন গোলাম আশরাফ তালুকদার। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে কিছু মহানগর নেতা অপপ্রচার করছেন। গণফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য গোলাম রব্বানী বাবলু এখন মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের দফতর সম্পাদক। গণফোরামে যোগদানের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমি ৯৮ সালে আওয়ামী লীগে ফিরে এসেছি।

মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য জহিরুল আলম গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৯২ সালে মোস্তফা মহসিন মন্টুকে দল থেকে বহিষ্কার করার প্রতিবাদে সে সময় সূত্রাপুরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কুশপুত্তলিকা দাহকারীদের একজন তিনি। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জহিরুল ইসলাম বলেন, আমি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলাম। গণফোরাম করার প্রশ্নই ওঠে না। নেত্রীর কুশপুত্তলিকার সঙ্গে আমাকে যারা জড়ানোর চেষ্টা করছেন, তারা রাজনীতিতে আমাকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন।

আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থেকেও মহানগরের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদকের পদ পেয়েছেন ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি মহানগরের শীর্ষ এক প্রভাবশালী নেতার আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সহসভাপতি মো. আবুল বাশার। তিনি জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে দাপুটে নেতা হিসেবে পরিচিতি ছিল তার।

আরেক সহসভাপতি খন্দকার এনায়েতুল্লাহ ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিতে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে তিনি সরকার সমর্থিত সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব।

হুমায়ুন কবীর ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সহসভাপতি। অভিযোগ রয়েছে, ১৯৭৯ সালে নবাবগঞ্জ পার্কে বিএনপির সভামঞ্চে দলটির প্রধান জিয়াউর রহমানের হাত থেকে ৫০ হাজার টাকার চেক গ্রহণ করেন তিনি। তবে শনিবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, ১৯৭৯ সালে নবাবগঞ্জ পার্কে জিয়াউর রহমানের সমাবেশ হয়েছে। তবে সেখানে আমি যাইনি। আমি ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছি। জিয়ার হাত থেকে টাকা নেয়ার প্রশ্নই আসে না।

একই কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল চৌধুরী একসময় ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা। ১৯৯৪-২০০১ সালে কমিশনার থাকাকালে মশার ওষুধ কেলেঙ্কারিতে তার নামও ওঠে। জানতে চাইলে কামাল চৌধুরী বলেন, আমি সরাসরি কমিউনিস্ট করিনি। তবে তাদের সংগঠন খেলাঘরের দায়িত্বে ছিলাম। মশার ওষুধ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগ সত্য নয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, অনেকেই আছেন যারা গণফোরাম ছেড়ে আওয়ামী লীগে গেছেন। তবে কে কোথায় আছেন, সেটি মনে করতে পারছি না। গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের একজন প্রভাবশালী নেতাসহ উল্লিখিত মহানগর নেতাদের অনেকেই গণফোরামের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গণফোরামের গত কমিটিতেও মহানগর আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির পদধারী একজন ছিলেন।

১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলিস্তানে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রে অভিযান চালিয়ে জুয়ার বোর্ড ও মাদকসহ ৩৯ জনকে আটক করে র‌্যাব। অভিযোগ আছে- এ ক্লাবে ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ক্লাবের পরিচালক ও শাহবাগ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলী আহমেদ। অভিযানের পর থেকে তিনি পলাতক আছেন। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের শীর্ষ এক নেতার অনুগত।

ক্যাসিনো চালানো, হত্যা, মাদক কারবার, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১১ অক্টোবর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজানকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। মিজান মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। একই কমিটির সভাপতি ছিলেন মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান। মিজান সাদেক খানের বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত। মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের এক নেতা যুগান্তরকে বলেন, মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খানসহ শীর্ষ পদের বেশ কয়েক নেতার সঙ্গে মিজানের সুসম্পর্ক ছিল। এসব নেতার আশ্রয়ে মিজান ক্ষমতাবান হয়ে উঠে। দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি করতে করতে শতকোটি টাকার মালিক বনে যান তিনি।

এছাড়া বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য বাদ পড়ার ঝুঁকিতে আছেন মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আসলামুল হক। দল না করেই পদ পাওয়া শিল্প সম্পাদক এ জাফর নিজামীও আছেন বাদের তালিকায়। দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয়তার কারণে বাদ পড়তে পারেন যুগ্ম সম্পাদক হাবিব হাসান, কৃষিবিষয়ক সম্পাদক এমএএম রাজু আহমেদ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মজুমদার। ধর্মবিষয়ক সম্পাদক সুফী সুলতান আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ ওয়াকিল উদ্দিনসহ অনেক নেতাই আছেন বাদের তালিকায়।

মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের একটি সূত্র বলছে, ক্যাসিনো-কাণ্ডে গ্রেফতার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট গ্রেফতারের পর অনেকের নাম আলোচনায় উঠে এসেছে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেক নেতা বলছেন, সম্মেলনে তাদের বাদ দেয়া হবে।

আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের আগে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু ক্যাসিনোতে জড়ানো নেতৃত্ব অপসারণ ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতৃত্ব তুলে আনতে নভেম্বরের মধ্যে সম্মেলনের নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। নির্দেশ পেয়ে সম্মেলনের প্রস্তুতি শুরু করেন ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নেতারা। ২০ ও ২১ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এ সম্মেলনের আগেই ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সম্মেলন করা হবে।

২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন হয়। এর ৩ বছর পর ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগকে দু’ভাগে বিভক্ত করা হয়। ২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর-দক্ষিণ, ৪৫টি থানা, ১০০ ওয়ার্ড ও ইউনিয়নগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নাম ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগের তখনকার সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

এর পরই ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। ঢাকা মহানগর উত্তরে আওয়ামী লীগের সভাপতি করা হয় একেএম রহমতুল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক করা হয় সাদেক খানকে। দক্ষিণের সভাপতি হন হাজী আবুল হাসনাত এবং সাধারণ সম্পাদক হন শাহে আলম মুরাদ। কিন্তু কমিটির মেয়াদ তিন বছর পেরিয়ে গেলেও তারা বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানা কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.