Breaking News

বৃষ্টির ছটায় সবুজের স্নিগ্ধতার আবেশ জড়িয়ে রেখেছে পাহাড়ি প্রকৃতি

ভর বর্ষায় পাহাড়ি প্রকৃতির নিজস্ব ডাক শুনেছেন? সবুজ অরণ্যের সেই ডাকেই এবারের গন্তব্য ছিল বান্দরবানের আলীকদম। এ যাত্রায় পথ মাড়িয়েছি দুর্গম দামতুয়া জলপ্রপাতের, এক বিকেল ভেসেছি মাতামুহুরী নদীতে। ঢাকা থেকে বাসে উঠেছিলাম ১ আগস্ট রাতে। সঙ্গী হয়েছিলাম একটি ভ্রমণ পরিচালনাকারী দলের। সকাল আটটা নাগাদ পা ফেলি আলীকদম বাসস্ট্যান্ডে, সেখান থেকে গন্তব্য কাছের পানবাজার। এই বাজারেই আগেভাগে ঠিক করা ছিল থাকার জায়গা। ছিমছাম রেস্টহাউস, প্রথম দেখাতেই বেশ পছন্দ হলো। সারা রাতের দীর্ঘ ভ্রমণের কিছুটা মিলে গেল আশপাশের প্রকৃতি পানে চেয়ে। বাকিটা রেস্টহাউসের সকালের নাশতা মুখে পুরে!

নাশতা সেরে যাত্রা করলাম ১৭ কিলোমিটার এলাকার উদ্দেশে। আলীকদম-থানচি সড়কের একটি এলাকা ১৭ কিলোমিটার। এটি এখন দেশের সবচেয়ে উঁচু সড়কপথ। স্থানীয়দের কাছে ডিম পাহাড় নামে পরিচিত পাহাড়ের চূড়া ডিঙিয়ে চলে গেছে থানচি পর্যন্ত। ১৭ কিলোমিটারের সেনাক্যাম্পে আনুষ্ঠানিকতা শেষে আরও আধঘণ্টার পর আদু মুরং পাড়ায় গেলাম। এখান থেকেই দামতুয়া জলপ্রপাতের দুর্গম পথে আমাদের যাত্রা শুরু । বৃষ্টির ছটায় সবুজের স্নিগ্ধতার আবেশ জড়িয়ে রেখেছে পাহাড়ি প্রকৃতি। বৃষ্টিভেজা পিচ্ছিল আর কাদামাখা খাড়া পাহাড়ি পথ বেয়ে ওঠা রোমাঞ্চকরই বটে। এমন সুন্দরের মধ্যেই কিন্তু বিপদ লুকিয়ে থাকে, রোমাঞ্চের হাতছানি অনেক সময় বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সেই সত্য মাথায় রেখেও আমরা হেঁটে চলি।

হাঁটতে হাঁটতে একসময় কানে বাজে ওয়াংপা ঝরনার কলতান। দূর থেকে জলপতনের শব্দ শুনতে শুনতেই আমরা হাঁটছিলাম। পথের অপরূপ দৃশ্য, জুমের খেত, পাহাড়ের ফাটল বেয়ে নাম না জানা ছড়াগুলো চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছিল। আমাদের এ পথচলা যেন সুন্দরের পথে যাত্রা। শুনেছিলাম পথটা তিন ঘণ্টার, আমাদের চার ঘণ্টা কেটে যায়। গাইড জানালেন এটাই শেষ পাহাড়। সেই খাড়া পাহাড় ধরে নেমে যার দেখা পেলাম, তার নাম ব্যাঙ ঝিরি। প্রথম দর্শনেই আমি নাম দিয়েছি ‘স্বর্গ সোপান’। ব্যান্ডদল লেড জেপলিনের ‘স্টেয়ারওয়ে টু হ্যাভেন…’ গানটা তখন লুপের মতো মস্তিষ্কের নিউরনের আর্কাইভে বাজছিল। খাঁজ কাটা সিঁড়ি বেয়ে নামছে পাহাড়ি জল। মনে হচ্ছিল অনন্তকাল এখানেই বসে থাকা যায়, সিঁড়ি বেয়ে চলে যাওয়া যায় অদেখা সুন্দরের দরজায়। কিন্তু যেতে হলো আরেকটু ওপরে, সেখানেই দামতুয়া জলপ্রপাত।স্নিগ্ধ ধারার দামতুয়া জলপ্রপাত

স্নিগ্ধ ধারার দামতুয়া জলপ্রপাত

কী আদি সৌন্দর্য তার। মনে হচ্ছিল যেন স্বর্গের দেবীরা জলের ধারা হয়ে চুল মেলে দিয়েছে। সেই জলে পা ডুবোতেই চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে গেল। যেন হারিয়ে গেলাম গভীরে, এ মুহূর্ত শুধুই অনুভবের। প্রকৃতির কাছে আর দুহাত প্রসারিত করে নিলাম একরাশ শুদ্ধতা।

ফেরার সময় হয়ে এল। বৃষ্টি হয়েছিল বলে পথ পিচ্ছিল। খাড়া পাহাড় বেয়ে ওঠার চেয়ে নামা বেশি কষ্টের, ঝুঁকির। তিনটা পাহাড় পেরোনোর পর বুঝলাম, আরও একটা বাকি। ততক্ষণে সূর্যের আলো নিবু নিবু। এদিকে আরেক কাণ্ড ঘটে গেছে। হন্টক, বায়েজিদ, শুভ্রা আর আমি—দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। অন্ধকার পথে এই গহিন অরণ্যে একমাত্র সম্বল তখন মোবাইলের আলো। হিসাব করে দেখলাম, ঘণ্টা দেড়েকের পথ তখনো বাকি। এমন অ্যাডভেঞ্চারের মুখোমুখি হব, অ্যাডভেঞ্চারের পথে পা বাড়িয়েও এতটুকু ভাবিনি। আরও কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম, চশমা হারিয়ে আমি অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। কেবল বায়েজিদ আর হন্টকের কথা শুনে অনুমান করে ঘুটঘুটে অন্ধকার খাড়া পাহাড় বেয়ে নামছি। গভীর জঙ্গল থেকে শোনা যাচ্ছিল নাম না জানা পোকার অদ্ভুত ডাক। বিষপিঁপড়ার কামড় আর পাহাড়ি কীটের কামড়ে হাত জ্বালাপোড়া করছিল। হাঁটতে হাঁটতে একসময় মনে হলো, এ পথের বুঝি শেষ নেই।

তখনই দেখলাম আমাদের গাইড ওয়াং সু পং টর্চলাইট হাতে দেবদূতের মতো আবির্ভূত হলেন। তিনি বাকিটা পথ নিজেই দেখিয়ে নিয়ে গেলেন। ঠিক রাত আটটায় আমরা এসে পৌঁছালাম, যেখান থেকে দামতুয়া জলপ্রপাতের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিলাম, ঠিক সেখানে। সব মিলিয়ে ৯ ঘণ্টার দুর্গম যাত্রা জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল।

মাতামুহুরীর রংধনু

চান্দের গাড়িতে করে দ্বিতীয় দিনের যাত্রা ডিম পাহাড়ের পথে। আলীকদম হয়ে থানচি বান্দরবানের এই সড়ক মোট ৩১ কিলোমিটার। সত্যিকারের রোলার কোস্টারের অভিজ্ঞতার জন্য এখানটায় এসে চান্দের গাড়ির ছাদে আপনাকে উঠতেই হবে। কী যে সুন্দর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর দুপাশের সবুজ প্রকৃতি! ২ হাজার ৮০০ ফুট ওপরে ডিম পাহাড়কে মারমা ভাষায় বলা হয় ক্রাউ ডং। ডিম পাহাড়ের যেখানটায় দাঁড়িয়েছিলাম, সেখান থেকে দেখা গেল সাংগু নদী। মেঘ আর আকাশের মিলনমেলা তখন জমে উঠেছিল। নিজেদের মনে হচ্ছিল মেঘ-পাহাড়ের সই!

সেদিন বিকেলটা কাটল মাতামুহুরী নদীতে। নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত নৌকাভ্রমণে বেরিয়েছিলাম। বাড়তি পাওয়া, এক ঘণ্টার ব্যবধানে পাঁচবার রংধনু দেখার পরম সৌভাগ্য হলো। দুপাশে পাহাড় আর স্রোতের বিপরীতে চলা মাতামুহুরী নদী। যার সীমা গিয়ে মিলেছে বঙ্গোপসাগর। রোদ–বৃষ্টির খেলায় বারবার মনে হচ্ছিল, ছোট্ট এই জীবন বড়ই সুন্দর! সেদিনের সুন্দর পুঁজি করেই নাগরিক ব্যস্ততায়।

যেতে চাইলে

ঢাকা থেকে আলীকদম পর্যন্ত হানিফ, শ্যামলীসহ বিভিন্ন পরিবহনের বাস আছে। ভাড়া ৮৫০ টাকা। আলীকদম বাসস্ট্যান্ডে নেমে সেখান থেকে পানবাজার যেতে হবে। পানবাজার থেকে চান্দের গাড়ি বা মোটরবাইক নিয়ে আলীকদম-থানচি সড়কের ১৭ কিলোমিটার এলাকার আদু মুরং পাড়ায় নামতে হবে। মোটরবাইকে জনপ্রতি ভাড়া ৩০০ টাকা আর চান্দের গাড়িতে মানুষ বেশি হলে ভাড়া কম লাগবে। সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে তথ্য দিতে হবে। ভ্রমণ শেষে বিকেল পাঁচটার মধ্যে ক্যাম্পে ফিরে আসতে হবে। আদু পাড়া থেকে দামতুয়া জলপ্রপাতে যেতে তিন-চার ঘণ্টা সময় লাগবে। সঙ্গে অবশ্যই গাইড নেবেন। গাইড ভেদে খরচ ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.